জীবন সঙ্গী (ষষ্ঠ পর্ব) - Mahbub Ullah

Breaking

Monday, December 23, 2019

জীবন সঙ্গী (ষষ্ঠ পর্ব)

জীবন সঙ্গী (ষষ্ঠ পর্ব)
লেখকঃ নাসির ইসলাম মাহিম
.
.
মাহিম অফিস থেকে বাসায় ফিরেছে। হিমি আর মাহমুদা বেগম বাসায় আসে বিকেল বেলা। মাহমুদা বেগমের বোন সকালে আসতে দেয় নি। তাই বাধ্যতামূলক বিকাল পর্যন্ত থাকতে হয়। হিমির ভালো সময় কেটেছে তার খালা শ্বাশুড়ির বাসাতে। সবাই তাকে খুব আদর যত্ন করেছে। কখনও ভাবতেই পারেনি। খালা শ্বাশুড়ি এরকম ভালো হয়।

 বিকেলে এসে ফ্রিজ রান্নার প্রস্তুতি নিতে নিতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। শ্বাশুড়ি বৌ মিলে রান্না করতেছে। কত করে হিমি তার শ্বাশুড়ি মাহমুদা বেগমকে রুমে যেতে বলে। কিন্তু, সে যাবে না। তার নাকি রান্না করতে বেশ ভালোই লাগছে আজ। অনেকদিন পর রান্না করছে। মাহিম তাকে রান্না করতে দেইনি। এবং-কি বাড়ির কোন কাজও না। ডাক্তার বলেছিল, "রান্নার কাজ না করলেই ভালো। চোখের প্রবলেম আরও বেড়ে যাবে।" সেই থেকে আর রান্না করতে দেইনি। সেদিন থেকে মাহিম রান্না করতে শিখে এট্টু এট্টু।

এদিকে মাহিম অফিসের কাজে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কাল একটা কাজে ভুল হয়েছিল। সেটা আবার ঠিক করতে হবে। খুব দ্রুত প্রজেক্টের কাজ শেষ করতে হবে। অফিসের বস খুবই চাপের মাঝে রেখে সব কর্মকর্তাদের। অফিসে সারাদিন খুব খাটাখাটুনি করতে হচ্ছে সবাইকে।

রাত ৯ বেজে গেছে। মাহিম অফিসের কাজে খুবই ব্যস্ত। খাবার খাওয়ার জন্য হিমি কয়েকবার ডেকে যায়। তবুও কাজ ফেলে যেতে পারছেনা। একটু পর হিমি আবার রুমে আসে। দেখে সেই একিভাবে কাজ করেই যাচ্ছে।
---কি হলো খাবেন না?
.
মাহিম হিমির দিকে তাকিয়ে মলিন হাসি দিয়। আবার ল্যাপটপের মুখ গুজে কাজ করতে করতে বলে,
তোমরা খেয়ে নাও। আমি কাজ শেষ করে খেয়ে নেব।
.
হিমি কোন কথা বললো না। ডাইনিং টেবিলের সামনে বসে পড়ে। চুল ছেড়ে দেয় খোঁপা খুলে। কোমড়ের নিচে চুল পড়ে যায়। অনেক লম্বা চুল। মাথা ভর্তি কালো কুচকুচে চুল। মাহিম একবার তাকিয়ে বলে,
না খেতে বসে। ডাইনিং টেবিলে বসে পড়লে যে। খাবে না?
.
হিমি কোন উত্তর না দিয়ে চুল আঁচড়াতে থাকে। মাহিম বুঝতে পারে হিমি রাগ করেছে। মেয়েরা খুবই অভিমানী।
কি হলো কথা বলছো না কেনো?
---আপনি কাজ করেন কথা না বলে।
---খাবে না।
আপনার কাজ শেষ হলে এক সাথে খাবো।
---মা।
---মা খেয়েছে।
---ওহ্। তাহলে তুমি মার সাথে খেয়ে নিতে।
.
হিমি কোন কথা বললো না। মাহিম বুঝতে পারে প্রচন্ডরকম রেগে গেছে। মাহিম হাতের কাজটা শেষ করে ল্যাপটপ বন্ধ করে হিমির পাশে এসে দাঁড়ায়। হিমি চুল আঁচড়িয়ে হাত খোঁপা করতে করতে বলে উঠলো,
---আপনার কাজ শেষ হয়েছে। আমি তো ভাবলাম সারারাত লেগে যাবে কাজ শেষ হতে।
.
বেশ অভিমান স্বরে বলে হিমি। মাহিম হিমিকে ধরে উঠিয়ে তার দিকে ঘুড়িয়ে নেয়। চোখে চোখ রেখে বলে,
আমার বউ টা যে, অভিমান করেছে। সে অভিমান করলে আমার কিছুই ভালো লাগেনা।
.
হিমি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে। মাহিম হাসে।
---চলো খাবো।
.
হিমি আর মাহিম খেতে যায়। মাহিমের পছন্দ ভুনাখিচুড়ি রান্না করেছে। সাথে একটা শুকনো মরিচ আর একটু আমের আচার। আচার দেখে মাহিম খেতে খেতে বলে,
---আমের আচার কোথায় পেলে?
---খালাম্মা দিয়ে দিছে।
---ও, কি হলো খাও।
---হুম আপনি খান।
---হা করো। কি হলো হা করো।
.
মাহিম হাত বাড়িয়ে এক লোকমা খাবার হিমির দিকে বাড়িয়ে দেয়। হিমি হা করে। মাহিম খাইয়ে দেয়। হিমির দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। মাহিম অবাক হয়ে যায়।
---কিছু হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেনো?
.
হিমি নাকটা টেনে বলে,
---কিছুনা। এভাবে মা-বাবা খাইয়ে দিতো আগে তো তাই।
---মা বাবাকে মনে পড়ছে খুব।
.
হিমি মাথা নাড়ায়। মাহিম চোখের পানি মুঁছে বললো,
কাল অফিস থেকে এসে নিয়ে যাবো। প্লিজ কেঁদনা।
---হুউম।
.
মাহিম আর কথা বাড়ায় না। হিমিকে খাইয়ে দিচ্ছে আর নিজে খাচ্ছে।

---আপনাকে একটা কথা বলবো?
.
মাহিম পাশ ফিরে তাকায়। হিমি কি বলতে চায় যে, অনুমতি চাচ্ছে?
হুম বলো। আর এতে অনুমতির কি আছে। আমাকে ফ্রি ভাবে যেকোন কথা বলতে পারো।
আপনি কি কাউকে ভালোবাসেন বা ভালোবাসতেন?
.
মাহিম রীতিমতো অবাক হয়ে যায়। হঠাৎ এ প্রশ্ন করলো। হিমি আবার বললো,
কি হলো বলুন। আর না বলতে চাইলে জোর করবো আমি।
আসলে সেরকম কেউ ছিল না। তবে প্রত্যেক মানুষের একবার করে এই রকম অনুভূতি জাগে। কাউকে পছন্দ হয়, ভালো লাগতে শুরু করে। সেরকম আমারও হয়েছিল।
.
মাহিম কথাটা বলে হিমির দিকে তাকিয়ে আছে। হিমির মুখটা মলিন হয়ে যায়। মাহিম আবার বলতে শুরু করে,
জানেন! তখন স্কুল ছুটি হলে ছুটে যেতাম গার্লস স্কুলের কাছে। আমাদের স্কুল একটু আগেই ছুটি হতো। আর তখন বন্ধুরা সহ সবাই চলে যেতাম। মেয়েটার জন্য ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম সেটা মেয়েটা বুঝেছিল। তখন থেকে সেও তাকিয়ে থাকতো। এভাবে চলতে থাকে কয়দিন। পরে একদিন লাভ লেটার দিতে গিয়ে, ওর বড়ভাইয়ের কাছে ধরা খেয়ে যাই ওদের বাসায়। পরে ওর বড়ভাই কিছু বলেনি। অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে পাঠিয়ে দেয়। পরে আর কখনও ওই গার্লস স্কুলের সামনে যাইনি। পরে আর কখনও বাসাতে যায়নি। পরে এসএসসি পরীক্ষা এসে যায়। টেষ্ট পরীক্ষা, ফাইনাল পরীক্ষা সামনে।
.
এতটুকু বলে মাহিম অন্যদিকে তাকায়। হিমি অবাক হয়। মাহিমের চোখে পানি। মাহিম চোখের পানিটা চটপট মুঁছে ফেললো। মাহিম হিমির দিকে তাকিয়ে থাকে। হিমি কিছু বলতে গিয়ে বললো না। মাহিম তখন বললো,
পরীক্ষা নিয়ে অনেক বিজি ছিলাম। টেষ্ট পরীক্ষার আগে বাবা মারা যায়। পরে মাকে সামালানো, বাজার, পড়াশোনা সব মিলিয়ে বড় একটা সমস্যার সম্মুখীন হলাম। টেস্ট পরীক্ষা চলে এলো। পরীক্ষায় অসম্ভব খারাপ হলো। দুটাতে ফেল করলাম। সামান্য ২ মার্কের জন্য। পরে ফর্মফিলাপ করলাম। পরে মা আমাকে প্রচুর হেল্প করলেন। আমিও খেলাধুলা, ঘোরাঘুরি সব বাদ দিয়ে পড়াশোনা আর কোচিং নিয়ে পড়ে থাকতাম। এভাবে চলতে থাকলো। এদিকে বাবার শোক, পড়াশোনা সহ মাকে সামলিয়ে রেজাল্ট আলহামদুলিল্লাহ মোটামুটি ভালো হয়। পরে স্বপ্নের  পথের পা বাড়ায়। ভালো কলেজে এডমিশন নিলাম। চান্স পেয়ে গেলাম। ভর্তি হোলাম। এভাবে চলে গেলো ১ বছর। ১ বছর পরে আবার মা অসুস্থ হলেন। বাবার জমানো টাকা থেকে মা'র চিকিৎসা করালাম। তাতে কোন উন্নতি হইনি। পরে এইচএসসি পরীক্ষার শেষে মা আবারো অসুস্থ হয়ে গেলেন। হোস্টেল থেকে বাসায় এলাম। পরীক্ষা বাসা থেকে দিলাম শেষের কটা। পরে মাকে বড় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলাম ঢাকাতে। বড় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলে, ডাক্তার বলে অপারেশন করাতে হবে। পরে জিজ্ঞেস করলাম কত টাকা প্রয়োজন? সে বললো, প্রায় ২ লক্ষ টাকা লাগবে। পরে মাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম।
.
এতটুকু বলে মাহিম চোখ মুছলেন। হিমি বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কি বলবে বুঝতে পারে না। মাহিম চোখ মুছে ফেলে আবার বলতে শুরু করলো,
বাসায় ফিরে মামাকে জানালাম। মা অনেক নিষেধ করে। বাবার জমানো টাকা ছিল ৭ লক্ষ টাকা। আমার হোস্টেল খরচ, মা অসুস্থ, খাওয়াদাওয়া সব মিলে প্রায় সব টাকা শেষ হয়ে যায়। মামা আমাদের বাসায় আসে। মামার সাথে পরামর্শ করে। বাবার ১ লক্ষ ৪৬ হাজার টাকা আছে। অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নিলাম। পরে অপারেশন করলাম। সব টাকা শেষ হয়ে যায়। ন্যাশনালে ভর্তি হলাম। পাশাপাশি মামার সুবাদে চাকরি পেলাম। সেই থেকে এই চাকরিটা করছি। গ্রাজুয়েট শেষ করেছি। আপনি হয়তো ভাবছেন এগুলো কেনো বলছি? কারণ, আমার এসব বলার কোন মানুষ পায়নি। ভেতরে খুব কষ্ট ছিল, খোভ ছিল। এখন মনটা হালকা হলো। কিছু মনে করবেন না। এখন ঘুমিয়ে পড়ুন।
.
কথাটা বলে মাহিম ওয়াশরুমে ডুকে পড়ে। হিমি চোখের পানি মুঁছে ফেলে। মনে মনে বলে, লোকটার ভেতরে অনেক কষ্ট। এতটা কষ্ট নিয়ে হাসিমুখে জীবনযাপন করছে। কতটা মাকে কেয়ার করছে। কতটা ভালোবাসে। এখন আমাকেও কতটা কেয়ার করে, ভালোবাসে, কতটা মূল্যায়ন করে। কথাটা ভাবতে ভাবতে বিছানা ঠিক করতে যায়।

প্রায় আধঘন্টা পর মাহিম ওয়াশরুম থেকে বের হয়। দেখে হিমি এখনও ঘুমায়নি। খাটের মাঝখানে জরোসরো হয়ে শুয়ে আছে। মাহিমের উপস্থিতি টের পেয়ে হিমি চোখটা মুঁছে ফেলে।
---আপনি এখনও ঘুমান নি?
.
গলাটা কেঁশে
না মানে ঘুম আসছে না তো তাই।
অনেক রাত হয়েছে। এখন কিছু না ভেবে ঘুমান।
.
মাহিম সোফাতে ঘুমাতে যায়। হিমি সেই একভাবে জোর সরো হয়ে শুয়ে আছে। মাহিম লম্বা শ্বাস ছেড়ে চোখ বুঝে ঘুমায়। আজ মনটা বেশ হালকা হালকা লাগছে। মনের ভেতর জমানো কষ্ট, খোভ সব বের করে দেয়।

No comments:

Post a Comment