জীবন সঙ্গী (চতুর্থ পর্ব) - Mahbub Ullah

Breaking

Saturday, December 21, 2019

জীবন সঙ্গী (চতুর্থ পর্ব)

জীবন সঙ্গী (চতুর্থ পর্ব)
লেখকঃ নাসির ইসলাম মাহিম।

সকাল সকাল হিমিকে ডাক দিয়ে জাগ্রত করে মাহিম। তার নাকি সকালে চা না খেলে সকালটা সুন্দর, ভালো করে শুরু হয়না। তাকে ডেকে নিয়ে কিচেনে নিয়ে যায়। হিমি ঘুম ঘুম চোখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে কিচেনে চলে যায়।

 মাহিম চা বানাচ্ছে, আর হিমি দাঁড়িয়ে থেকে ঘুমাচ্ছে। মাহিম কিছুক্ষণ পর পর জিজ্ঞেস করে, "কি হলো, এখনও ঘুম ছাড়েনি। কি ঘুম আপনার রে বাবা। দাঁড়িয়ে থেকে ঘুমাতে পারেন।

মাহিম যতই হাসানোর চেষ্টা করে ততবারই ব্যর্থ হয়। এতে হিমির ঘুম ছাড়েনি। চা বানানো শেষ হলে, চা'য়ের কাপটা হিমির হাতে স্পর্শ করার সাথে সাথে, হিমি চিৎকার দিতেই মাহিম মুখ চেপে ধরে। হিমি অবাক হয়ে যায়। লোকটার কান্ডকারখানা দেখে। মাহিম আস্তে করে বলে,
সবাই জেগে যাবে তো। তখন কি কেলেঙ্কারির ঘটে যাবে বলুন তো। চলুন রুমে যাই।
.
হিমি আর মাহিম খুব সাবধানে উপর তলায় উঠে আসে। রুমে এসে দরজা লক করে একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো,
বাঁচা গেল বাবা। কি ভয় টা না পেয়ে ছিলাম। আর একটু হলে সবাই জেগে যেত। সবাই বলতো, জামাই চা খেতে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে কিচেনে এসেছে।
.
হিমি শুধু ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে। এখনও পুরোপুরি ঘুম ছাড়েনি। এখনও ঘুমের তৃষ্ণা জড়িয়ে ধরে আছে তাকে। মাহিম হিমির হাতে হাত রাখতেই হিমি চোখ মেলে তাকায়। এত সকালে কোনদিনই উঠেছে কিনা সন্দেহ। মাহিম হিমির হাতে কাপটা দিয়ে বলে উঠলো,
গরম গরম চা'টা চটপট খেয়ে নিন।
.
হিমি চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে ভাবছে। চা খাবে, নাকি খাবে না! মাহিম চা এক চুমুক দিয়ে বলে উঠলো,
কি হলো খান।
---হুম।
.
হিমি চা এক চুমুক দিতে মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ঠিক কালকের মত মন জুরানো চা হয়েছে।
---আপনাকে ধন্যবাদ।
.
মাহিম হাসে। হিমি চা খেকে ব্যস্ত হয়। মাহিম চা শেষ করে বসে থাকে। হিমির একটু পর চা খাওয়া শেষ হলে হিমিকে ঘুমাতে বলে। হিমি আর একটুও দেরি না করে ঘুম দেয়। মাহিম বসে থাকে বারান্দায়। এই সকালে সকালটাকে উপভোগ করা ছাড়া কিছুই নেই। যে ছিল, সে ঘুমাতে ব্যস্ত।
 .
.
দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে পৃথিবীতে। মাহিম আর হিমিকে নিতে এসেছে মাহিমের বাড়ি থেকে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে অতিথি আপ্যায়ন শেষে সবাই যার যার মত খাস গল্পে মেতে উঠেছে, বিভিন্ন যায়গায়। এদিকে মাহিমের মামা খুব তাড়া দিচ্ছে। বাসায় যেতে হবে।

মাহিম হিমির রুমে বসে আছে। হিমি বিছানার মাঝে কিছু একটা ভাবছে।
---কি হলো, কি ভাবছেন এত?
.
মাহিমের কথা শুনে হিমি মাহিমের দিকে তাকায়। করুণার স্বরে বলে উঠলো,
আমাকে রেখে যাবেন প্লিজ। আমার মা-বাবাকে রেখে, এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।
.
মাহিম হিমির পাশে গিয়ে বসে খাটে। তারপর হিমির হাতের উপর হাত রেখে চোখে চোখ রেখে বলে,
জানি কোন মেয়ের ভালো লাগেনা। কিন্তু, বিয়ের একটা নিয়ম, নিতি আছে সেটা না মানলে নাকি সম্পর্কের মাঝে মহব্বত তৈরি হয় না। আরও অনেক কিছু হয়। তাই বাধ্যতামূলক সেগুলো মানতে হয়।
.
হিমি মাহিমের কথাটা শুনে রাগ করে। গাল ফুলিয়ে লাকেস গোছাতে থাকে। মাহিম বুঝতে পারে।
---হিমি! প্লিজ রাগ করবেন না। রাগ করে থাকলে খুব খারাপ লাগে আমার।
.
হিমি একবার তাকিয়ে আবার কাপড়চোপড় গোছাতে লাগে। মাহিম হিমির নিরবতা দেখে বলে,
আজকে চলো। দুদিন পর আবার তোমাকে আমি রেখে যাবো। এবার একটু হাসো।
.
মাহিমের কথা শুনে হিমি হাসার চেষ্টা করেও পারেনি। প্রিয়জনদের ছেড়ে থাকতে কতটা কষ্ট সেটা একমাত্র তারাই বোঝে।

 মাহিম হিমির সামনে বসে পড়ে। হিমি লাকেস গোছাতে ব্যস্ত। চোখের মাঝে অশ্রুপাত। মনের মাঝে খারাপ লাগা। সব মিলিয়ে একটা মন খারাপের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
.
প্রায় ১ ঘন্টা পর হিমিদের বাসা থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসে। গাড়ির ভেতর বসে আছে। হিমি কাঁদছে খুব। মাহিম হিমিকে কাঁদের উপর মাথাটা রেখে অনেক শান্তনা দিচ্ছে। তবুও হিমির কান্না বিন্দু পরিমাণ হ্রাস পায় নি।

 আসার সময় তো হিমির মা জড়িয়ে ধরে কাঁদে। কেউ কাউকে ছাড়তে চায় না। বিয়ে নামক শব্দ মায়া-মমতার স্থান থেকে সব কিছু ত্যাগ করে পাড়ি দিতে হয় শ্বশুর বাড়িতে।
.
সেদিন এসে হিমি খাবার খায়নি। সারা রাস্তা কাঁদার ফলে প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছিল। না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মাহিম মেডিসিন কপালে মেখে দেয়। মাথায় নবরত্ন তেল দিয়ে চাঁদরটা গায়ের উপর দিয়ে দেয়। রাতে খেতে বললে খায়নি। পরে আর ডাকেনি মাহিম।

এভাবে রাত কেটে যায়। ফজরের কিছুক্ষণ পূর্বে মাহিম তার মা মাহমুদা বেগমকে ঘুম থেকে উঠিয়ে ব্রাশ করিয়ে দেয়। তাকে ফ্রেশ করে ওযু বানিয়ে দিয়ে রুমে এনে নামাজের স্থানে রেখে মাহিম চলে যায় হিমির কাছে।

 এদিকে মাহিম ফজরের আযানের সময় হিমিকে রোজ ডেকে নামাজের প্রস্তুতি করিয়ে দেয়। কখনও কখনও দাঁত ব্রাশ করিয়ে দেয় মাহিম। ফ্রেশ হয়ে যখন ওযু করে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ে, তখন মাহিম মসজিদে চলে যায়।  খুব সকালে তিন কাপ চা করে মাকে দিয়ে আসে এক কাপ। আর দু'কাপ হিমিকে নিয়ে রোজ চা খায় বারান্দায় বসে।

টিন সেট চাল। শিশির বিন্দু জমে উঠেছে টিনে। সেরকম শীত পড়েনি। মাঝরাতে একটু শীত শীত করে।

এভাবে দিন চলতে থাকল সব। কিছুটা বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক হয়েছে আমাদের। আপনি থেকে তুমিতে রুপান্তিরিত হয়েছে। কিন্তু, হিমি আপনিতে রয়েগেছে।

 হিমিকে হাত, কপালে স্পর্শ ছাড়া ইচ্ছে করে স্পর্শ করিনি। সবাই তো চাই নিজের বউ এর ভালোবাসা পেতে। সেরকম আমিও চাই আমার বউ এর ভালোবাসা পেতে, ভালোবাসতে। কিন্তু, তার ভেতরে আকাশ ছোঁয়া পরিমাণ রাগ আর ঘৃণা জন্ম হয়েছে ভেতরে। সেখানে ভালোবাসার ফুল ফুটাতে, রাগ, ঘৃণা সব কিছু ভুল প্রমাণ করতে হবে। তারপর কাছে টেনে নেব তাকে। সেও কাছে টেনে নিবে আপন করে। ভালোবাসার পরশ জুড়িয়ে দেবে আমাকে। আমি আর হিমি ভালোবাসার সাগরে ভেসে ভেড়াবো।

মাহিমকে বিয়ের জন্য অফিস থেকে ছুটি দিয়ে ছিল ১ সপ্তাহ। পরে মায়ের অসুখের জন্য বসের সাথে কথা বলে আরও ৫ দিন বেশি ছুটি নিয়ে নেয়। বস মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে ছুটি আরও ৫ দিন বাড়িয়ে দেয়।

১ সপ্তাহ ৫ দিন পর আজ অফিসের ছুটির জন্য রেডি হচ্ছে। হিমি ডাইনিং এ বসে সাজগোছ করছে। মাহিমের মা মাহমুদা আর হিমি তার বেড়াতে যাবে তার খালার বাসায়। হিমি প্রথমে রাজি হইনি কোথাও যেতে। বাসায় যাবার কথা বলে সেদিন এসেছিল। কিন্তু তার শ্বাশুড়ীর অসুখটা বেশি হওয়াতে যেতে পারেনি। সেও জোর করেনি এমন অবস্থাতে ফেলে নিজে বাবার বাসাতে যেতে। তাই আর যাওয়া হইনি। এখন একটু সুস্থতা হয়েছে। তাই হিমি রাতে খেয়ে এসে শুয়ে থাকার সময় বলেছিল,
আমি বাড়িতে যাবো। আম্মাকে বলেছি। সে বলেছে ঠিক আছে যেও। শুধু আপনি যেতে বললে যাবো।
.
মাহিম নিশ্চুপ থেকে বলে,
---মা তো এখনও পুরোপুরি সুস্থ নন। দুদিন পর যেও।
.
হিমি মন খারাপ করে শুয়ে পড়ে। মাহিম বুঝতে পারে হিমি মন খারাপ করেছে।
---তুমি মন খারাপ করেছো।
---না,
.
হিমি মাথা নাড়ায়। মাহিম আর কথা বাড়ায়নি। লাইট অফ করে সোফাতে ঘুমিয়ে পড়ে। তখন থেকে মন খারাপ করে আছে হিমি। এমনিতে কথা কম বলে। তারপর আরও কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। মাহিম রেডি হতে হতে বলে উঠলো,
আপনি আজকে খালার বাসায় থেকে ঘুরে আসুন। কাল আপনাকে বাসায় নিয়ে যাবো।
.
হিমি এক নজর তাকিয়ে হাসলো। মাহিম আর কিছু বললো না। রেডি হয়ে হিমির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। হিমি আয়নাতে চোখটা উুঁচু করে তাকায়। মাহিম বললো,
আমি সিএনজি ওয়ালাকে বলে দিয়েছি। কিছুক্ষণের ভেতর চলে আসবে। বাসার কাছে নামিয়ে দিয়ে আসবে। আর সায়েমকে ফোন দিয়ে বলে দেবনি। আসার সময় সিএনজি ঠিক করে দেবেনি।
---আপনি যাচ্ছেন না?
.
হিমি কথাটা বলে মাহিমের দিকে তাকিয়ে আছে। মাহিম মৃদু হেসে বললো,
আমার অফিসে যেতে হবে। আজ একটা ইম্পর্টেন মিটিং আছে। সেখানে এটেন করতেই হবে। বড় প্রজেক্ট তো তাই।
---ওহ্, ঠিক আছে।
---আমি তাহলে যাই।
.
মাহিম রওনা দিতে হিমি ডাক পিছুডাক দেয়। মাহিম হিমির কাছে চলে আসে।
কিছু হয়েছে? আচ্ছা তোমার কি পছন্দ বরো তো! আসার সময় নিয়ে আসবো।
আমার জন্য কিছুই আনতে হবেনা। এই নিন আপনার হাত ঘড়ি। ঘড়িটা রেখে যাচ্ছেন। হাতটা দিন,
.
হিমির কথাটা শুনে মাহিম আর একটু দেরি না করে হাতটা এগিয়ে দেয় হিমির দিকে। হিমি মাহিমের হাতে ঘড়ি পড়িয়ে দিতে বলে,
ঘড়ি হচ্ছে প্রিয় বন্ধুদের ভেতর একজন।
এখন যাই কেমন,
-না।
---কেনো?
---পিছুডাকার পর, কিছুক্ষণ পর যেতে হয়। না হলে অমঙ্গল হয়।
.
মাহিম হাসে। হিমি প্রশ্নচিহ্ন চোখে তাকিয়ে থাকে।
তুমি এসব বিশ্বাস করো।
না মানে, মা এসব মানতো আর দাদিও।
এসব কিচ্ছুই হবেনা। আল্লাহর রহমত। মায়ের দোয়া আর তোমার দোয়া থাকলে আমার কিছুই হবেনা।
আপনি যাবেন না এখন। একটু বসুন তারপর যাবেন।
---ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে,
.
মাহিম বিছানায় বসে। হিমি উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে মাহিমের দিকে বাড়িয়ে দেয়। মাহিম তাকিয়ে থাকতে দেখে হিমি বললো,
---কি হলো খেয়ে নিন।
.
মাহিম ঢকঢক করে গ্লাসের সব পানি খেয়ে নেয়। তারপর কাধে অফিসের ব্যাগ ঝুলিয়ে রওনা দিতে হিমি বলে উঠে,
পৌঁছে ফোন দিয়েন।
ঠিক আছে। আর মাকে দেখে রেখ একটু। বুড়ো মানুষ। বয়স হয়েছে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেনা।
.
হুউমম।
মাথা কাত করে।
---আল্লাহ্ হাফেজ।
.
কথাটা বলে হিমির কপালে ভালোবাসার পরশ ছুঁয়ে দেয় মাহিম। হিমি উষ্ণকমল ঠোঁটের ছোঁয়া পেয়ে কেপে উঠে। মাহিম অফিসে চলে যায়।

হিমি সাজগোছ করে মাহমুদা বেগমের রুমে আসে।  দেখে যে মাহমুদা বেগম বসে আছে। মায়ের পাশে বসে পড়ে। মাহমুদা বেগম হিমির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

হিমি দেয়ালের দিকে তাকাতে চোখ আটকে যায়। দেওয়ালে কয়েকটা ছবি ঝুলানো। তার ভেতর একটা মাহিম আর সাথে একটা মেয়ে। তখন হিমি মাহমুদা বেগমকে বলে,
---মা ওই ছবিটার সাথে, মেয়েটা কে?
---ওটা ওর মামা তো বোন।
---ও,
---কেনো?
---এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম মা।
আসলে ওই মেয়েটার জন্য আমার ছেলের মনটা ভেঙ্গে গেছে।
.
মাহমুদা বেগমের কথাটা শুনে হিমির বুকের ভেতর ধকধক করে উঠে। মেয়েটার জন্য কি এমন হয়েছিল যে, মনটা ভেঙে গেছে!
বুঝলাম না মা আপনার কথাটা।
.
মাহমুদা কথার প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলে উঠলো,
তোকে বেশ সুন্দর লাগছে। একদম পরীর মত লাগছে। ঠিক যেন আকাশ থেকে পরী নেমে এসেছে।
.
হিমি লজ্জা পেয়ে যায়। মাথা নিঁচু করে। মাহমুদা বেগম বললো,
---চল মা এখন বের হই।
---হ্যা মা চলেন।
.
দুজনে বেড়িয়ে পড়ে। সিএনজি আগে থেকে এসে অপেক্ষা করছে। দুজনে গিয়ে সিএনজিতে উঠে বসে। সিএনজি চলতে শুরু করে।

হিমির মনের মাঝে একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। মেয়েটার সাথে কি সম্পর্ক ছিল উনার? প্রেম করে ধোঁকা খায়নি তো? নাকি তারা বিবাহ করেছিল? আমাকে মিথ্যে বলেছিল বাবা। যে, ছেলে বিয়ে করেনি। আমি কি অমত ছিলাম যে মিথ্যে বলতে হবে।

No comments:

Post a Comment