জীবন সঙ্গী (তৃতীয় পর্ব) - Mahbub Ullah

Breaking

Thursday, December 19, 2019

জীবন সঙ্গী (তৃতীয় পর্ব)

জীবন সঙ্গী  (তৃতীয় পর্ব)
লেখকঃ নাসির ইসলাম মাহিম


হিমিদের বাসায় পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে রাত প্রায় হয়ে যায়। বাড়িতে মেহমান দিয়ে গিজগিজ করছে। বিয়ের দিন তো এতো মেহমান ছিল না। আজ অনেক মেহমান এসেছে। হঠাৎ এত মেহমান আসার কারণটা মাহিম বুঝতে পারেনি। কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়ে করে নি।

খেয়েদেয়ে রুমে বসে আছে মাহিম। হিমি মায়ের কাছে চলে গেছে। সেখানে আরও মেহমান এসেছে তাদের সাথে কথা বলছে। এদিকে মাহিম একা একা বোরিং হচ্ছে। সেদিকে হিমির কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। মাহিম কবার বারান্দায় পায়চারি করে। পরে আবার বিছানায় এসে আধোশোয়া হয়ে শুয়ে আছে। দরজায় নক করার শব্দ শুনে মাহিম দরজার দিকে তাকায়। দেখে হিমির খালাতো বোন নিহি। মাহিম নড়েচড়ে বসে বলে উঠলো,
---ভেতরে আসো নিহি।

নিহি ভেতরে চলে আসে। মাহিমের পাশে বসে। নিহি যে খুব দুষ্ট সেটা বাসাতে এসেই বুঝে ছিল। যখন হিমি আর মাহিম রুমে রেস্ট নিচ্ছিল তখন কই থেকে ছুঁটে এসে ছিল। সাথে আরও কিছু তার বয়সি মেয়ে এসেছিল। হিমি ওয়াশরুমে যেতে দেখে নিহি বলে উঠলো,
দুলাভাই বাসর রাতে বিড়াল মেরে ছিলেন।
.
কথাটা বলে নিহি হেসে হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। সাথে সেই দুষ্টগুলোও হাসছিল মুখে হাত দিয়ে। মাহিম তার কথা শুনে হতবাঘ। এতটুকু মেয়ে বাসর রাতে বিলাই মারতে হয় সেটাও জানে। কি পাকনারে রে বাবারে বাবা! মাহিম একবার নিহির দিকে আড় চোখে তাকাতে দেখে এক পিচ্চি কানে কানে কি যেন বলছে। আর হেসে কুটিকুটি হচ্ছে নিহি। মাহিম আড় চোখে দেখে যাচ্ছে তাদের দুষ্টস্বভাব গুলো। মাহিম নিশ্চুপ হয়ে মাথা নিচু করে আছে। তখন আবার নিহি বলে উঠলো,
দুলাভাই! বিলাই মারেন নি নাকি রাতে হুম।
.
ভ্রুনাচিয়ে বললো কথাটা নিহি। মাহিম কিছু বলতে যাবে তখন ওয়াশরুমের দরজা থেকে বের হতে বলে,
তোদের না মেরে দাঁত ভেঙ্গে ফেলব খারা। বড়দের সাথে পাকনামি করা ছুটাচ্ছি।
.
দুষ্টগুলো দৌড়ে পালিয়ে যায়। মাহিম মুখ চেপে হাসছে। হিমি হাত মুখ মুছতে মুছতে বললো,
আপনি কিছু মনে করবেন না। আসলে ওরা খুব দুষ্ট। তবে খুব ভালো।
তা দেখে বোঝাই যায়। আর এমনিতে কিন্তু মিষ্টি করে কথা বলে।
.
হিমি আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ ড্রইং টেবিলের সামনে বসে পড়ে। মাহিম হিমির দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর চাপা স্বরে বলে,
আপনিও কিন্তু মিষ্টি করে কথা বলেন।
.
হিমি মাহিমের দিকে একবার তাকিয়ে চুলে চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতে থাকে। মাহিম আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ ভাবতে থাকে। কিছুক্ষণ পর হিমির খালাতো ভাবি এসে আবার খেতে নিয়ে যায়। মাহিম খেতে চাইনি। কিন্তু জোরাজোরি করাতে চলে যায়।

খাবার খেয়ে এসে দুষ্টুদের সাথে অনেক মজা করে মাহিম। সবাই যে কতটা দুষ্ট হতে পারে তা মাহিম বুঝতে পারে কথা বলে। কতরকম কথা বলে হাসাহাসি করে তারা। হিমিকে দেখে সবাই চুপ মেরে যায়। সবাই বিছানা ছেড়ে দাঁড়ায়। তার পর হিমি বলে,
সবাই এখন ঘুমিয়ে পড়। অনেক রাত হয়েছে।
নিহি তখন বললো,
আপু আর একটু গল্প করি। কালতো দুলাভাই চলে যাবে। আর একটু গল্প করি আপু।
সকালে অনেক গল্প করো অনেক। এখন যাও ঘুমো।
---আপু,
---বলছিনা অনেক রাত হয়েছে। যাও বলছি,
.
হিমি চোখ বড় বড় করে গরম চোখে তাকিয়ে কথাটা বলে। সবাই ভয়ে চলে যায়। যাবার সময় দুষ্ট চোখের ইশারায় বললো, সকালে অনেক গল্প করবো দুলাভাই।

দুষ্টরা চলে গেলে মাহিম ওয়াশরুমে চলে যায়। হিমি বিছানা ঠিকঠাক করে। একটুপর মাহিম ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসে। হিমি তখন বললো,
শুয়ে পড়ুন। অনেক রাত হয়েছে।
---আপনি উপরে শুয়ে থাকেন। আমি সোফাতে ঘুমিয়ে যাই।
---শুনুন।
---হ্যাঁ বলুন। কিন্তু, বারান্দায় ঘুমাতে যেতে বইলেন না আবার।
.
হিমি চোখটা বুজে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
আমাকে দেখে কি আপনার স্বার্থপর মনে হয়?
---আসলে না,,মা,নে,
না মানে, না মানে করতে হবেনা। বিছানায় শুয়ে পড়ুন।
---একটা কথা ছিল।
.
হিমি মাহিমের চোখের দিকে একবার তাকিয়ে বলে,
---বলুন,
---যদি ভুল বশত অনৈতিক স্পর্শ হয়ে যায়।
.
হিমি চোখ মুখ শক্ত করে গরম চোখে তাকিয়ে আছে। মাহিম কিছুটা ইতস্তত করে বলে,
না মানে, ঘুমের ঘরে যদি আপনাকে জড়িয়ে ধরি তাহলে তো আমাকে ঘৃণা করবেন। এমনিতে পুরুষ মানুষ আপনার দু চোখে পাতার ঘৃণার পাত্র। তাই আমি চাই না, দ্বিতীয় বার সেই ঘৃণাটা মনের মাঝে ক্ষণস্থায়ী হয়ে বসে পরুক।
.
মাহিম কথাটা বলে হিমির চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। হিমি কিছুটা অবাক হয়ে যায় মাহিমের কথাটা শুনে। এই কথার প্রসঙ্গে কি কথা বলতে হয় হিমির অজানা। কিছু বলতেও পারছেনা। মাহিম হিমির নিরবতা দেখে বলে উঠে,
আচ্ছা, এত চিন্তা করতে হবে না। আমি বারান্দায় গিয়ে শুয়ে থাকতে পারবো।
.
মাহিম কথাটা বলে বালিশ হাতে নেয়। হিমি তখন বলে উঠে,
দেখেন, কেউ যদি দেখে ফেলে কেলেঙ্কারির ঘটে যাবে। না থাক, আপনি বিছানায় শুয়ে পড়ুন। মাঝখানে কোলবালিশ রেখ দেব। তাহলে তো আর সমস্যা নেই। আর ওরা যে দুষ্ট, দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকে দেখে যে আপনি সোফায় তাহলে কি হবে ভেবে দেখেছেন?
.
মাহিম মৃদু হাসলেন কিছুই বলেন না। হিমি তীক্ষ্ণ চোখে মাহিমের মৃদু হাসিটা দেখে মনে মনে বলে উঠলো, "লোকটার কোন।মতলব আছে নাকি? না, নেই। থাকলে কাল রাতে ঘুমের ঘোরে পুরুষত্ব ফলাতে চেষ্টা করতো। আর তার তাকে দেখে সেরকম কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তার ব্যবহারে, আচার-আচরণে সেরকম কিছুই প্রকাশ ঘটেনি। হযরত মুহাম্মদ (স) এর সুন্নত অনুসারীরা কখনও এই জঘন্যতম কাজ করতে কিছুতেই পারেনা। আর কখনও পারবেও না। এটা আমার বিশ্বাস।
---কিছু ভাবছেন?

 হিমি চমকে যায় মাহিমের কথায়। তারপর আমতাআমতা করে বলে,
কই কিছু নাতো।
তাহলে আমি যাই বারান্দায়।
.
হিমি রাগী চেহারার প্রকাশ প্রায়। রাগী স্বরে বলে,
কতবার বলবো এক কথা।
---যদি আমি,
আপনার আমাকে পাবার খুব সখ তাই না। এই নিন আপনার স্ত্রীকে,
.
চোখ বন্ধ করে বুকের উপর থেকে শাড়ির আঁচল সড়িয়ে দেয় হিমি। ততক্ষণে মাহিম ওয়াশরুমে চলে গেছে। হিমির চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় ঝর্ণার মত পানি পড়ছে। মনে মনে বলে, "সব পুরুষই মেয়েদের শরীরকে ভালোবাসে। কখনও শরীরের ভেতর মন থাকে সেটা বোঝার চেষ্টা করেনা। সেটাকে কখনও ভালোবাসার চেষ্টা করে না। মেয়েরা এমনি কাঙ্গাল, একটু বিশ্বাস সঞ্চয় হলে, ভালোবাসা পেলে, ভরসা পেলে সব উজাড় করে দেয়। মৃত্যুতে ঝাপিয়ে পড়তে পারে তার জন্য। হিমি চোখ না খুলে বলে,
কি হলো, আপনার পুরুষত্ব ফলান। আমি তো আপনার বিয়ে করা বউ। আপনার জন্য আমি হালাল, আপনি আমার জন্য হালাল। পশুর মত ছোবল না মেরে একদম মেরে ফেলুন। কি হলো  নিন। আপনার মনের বাসনা পূর্ণ করে নিজেকে আমার থেকে মুক্ত করুন।
.
হিমি কোন শব্দ না পেয়ে চোখ মেলে তাকায়। কাউকে না দেখে বেশ অবাক হয়ে যায়। লোকটা গেলো কোথায়? বারান্দায় চলে যায়-নি তো? দেখি একটু। শাড়িটা ঠিকঠাক করে নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। বারান্দায় গিয়ে মাহিমকে দেখতে পায় না। তাহলে ডাইনিং রুমে যায়নি তো?

হিমি দরজাটা আস্তে করে খুলে ডাইনিং রুমে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখে সেখানেও নেই? লোকটা গেলো কই? রুমে চলে আসে হিমি। বিছানায় বসে মনে মনে বলে,  "বাসায় চলে যায়নি তো! তাহলে বাবাকে কি বলবো কাল সকালে? অনেকটা ভয় পেয়ে যায় হিমি।

কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ শুনে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়। উনি, ওয়াশরুমে ছিল। একবার ওয়াশরুমে উঁকি দিলে এতটা টেনশন করতে হতো না। বাবা ঠিকই বলে," আমি অনেকটা মাথা মোটা। হিমিকে একা একা বিরবির করতে দেখে মাহিম বলে,
স্যরি। আপনার তোয়ালে ব্যবহার করার জন্য।
.
হিমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। লোকটার চোখটা লাল হয়ে আছে। সে কি কেঁদেছে? হিমি তখন বলে উঠলো,
আপনি কি কেঁদেছেন?
কই নাতো।
তাহলে চোখ লাল বর্ণ হয়েছে যে।
---শাওয়ার ছাড়তে কি যেন এসে চোখে লাগলো। সেটা বের করতে চোখ লালচে ধারণ করেছে।
কই দেখি, দেখি কি পড়েছে চোখে।
.
কথাটা বলে হিমি মাহিমের সামনে চলে আসে। মাহিম মনে মনে বলে, "মেয়েদের মনটা বেশ নরম, কমল, আর মায়াভরা। যাদের প্রতি ঘৃণা জন্ম নিয়েছে তাদের সাহায্য করতে দ্বিধাবোধ করে না। সবাইকে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়। মাহিম শান্তস্বরে বলে,
---এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়বেন না। আমার কিছুই হয়নি।
.
হিমি মাহিমের কথাটা না শুনে চোখটা ভালো করে দেখে কিছুই নেই। তখন হিমি বলে,
ঘুমান। মাঝখানে কোলবালিশ রেখে দিয়েছি।
.
মাহিম ঘুমিয়ে পড়ে। হিমি লাইট অফ করে ডিম লাইট দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তেমন একটা শীত নেই। চাঁদর না গায়ে দিলে চলবে ভেবে আর চাঁদর নেই নি শরীরে। হিমি একবার কাত হয়ে মাহিমের দিকে তাকায়। মাহিম অন্য পাশ হয়ে শুয়ে আছে। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। হিমি লম্বাশ্বাস ছেড়ে ঘুম দেয়। চোখে ঘুম থাকাতে কিছুক্ষণের ভেতর গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় হিমি।

এদিকে মাহিমের চোখে ঘুম নেই। মনে মনে ভাবে আমি কি সে-রকম যারা নারীর কমল হৃদয়ে উপরে থাকা শরীরটা পশুর মত পুরুষত্ব ফলায়? না, আমি সেরকম না। আমার মা-বাবা সেরকম কোন শিক্ষা দেইনি। তারা আদর্শের মত, একটা আদর্শ শিক্ষা দিয়েছে। দিয়েছে, নারীদের কিভাবে সম্মান দিতে হয়। কিভাবে, তাদের রক্ষা করতে হয়। কিভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে যেতে হয়। আমাকে যথেষ্ট পরিমাণ সব শিক্ষা দিয়েছে আমার মা-বাবা। চোখের পানি মুঁছে ফেলে মাহিম। দুচোখের পাতায় ঘুম নেই। কেমন জানি হিমির কথাগুলো মনের মাঝে গেঁথে আছে।

হিমির দিকে এপাশ হয়ে দেখে হিমি গভীর ঘুমে আছন্ন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলে উঠলো, "একদিন তুমি আমাকে ভালোবেসে স্পর্শ করবে। আমার ভালোবাসা দিয়ে তোমার সব ভুল ভাঙ্গাবো। তোমার পুরুষদের প্রতি,  রাগ-ক্ষোভ, ঘৃণা সব কিছু মুছে দেব আমি। বুঝিয়ে দেব, সব পুরুষই শরীর চায় না। কিছু পুরুষ, শরীরের ভেতর থাকা সুন্দর মনকে চায়।

No comments:

Post a Comment