জীবন সঙ্গী (দ্বিতীয় পর্ব) - Mahbub Ullah

Breaking

Tuesday, December 17, 2019

জীবন সঙ্গী (দ্বিতীয় পর্ব)

জীবন সঙ্গী (দ্বিতীয় পর্ব)
লেখকঃ নাসির ইসলাম মাহিম

কারও স্পর্শে ঘুম ভেঙে যায় হিমির। চোখ মেলে তাকাতে মাহিমকে দেখতে পায়। মাথায় টুপি, নীল কালারের পাঞ্জাবি, মুখ ভর্তি দাড়ি। দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। হিমি হা করে তাকিয়ে আছে। চোখ সরাতে পারছেনা। জানালা দিয়ে মৃদু আলোর উজ্জ্বল তার অর্ধ মুখে এসে পড়েছে। হিমির এরকম তাকানো দেখে দুষ্টামি করে মাহিম বলে উঠলো,
এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না। নজর লেগে যাবে।
.
হিমি মাহিমের কথাটা শুনে লজ্জায় চোখ সরিয়ে নেয়। খুব লজ্জা পেয়েছে। কখনও এরকম করে কেউ বলেনি কথাটা। মাহিম মৃদু হাসে। তার দুষ্টামি খুবই লজ্জিত করেছে হিমিকে। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে মাহিম বলে উঠলো,
আসলে আমি স্যরি। আপনার অনুমতি না নিয়ে আপনাকে স্পর্শ করেছি। আমি ইচ্ছে করে স্পর্শ করে নি। আপনাকে দুবার ডেকে ছিলাম। কিন্তু, জাগ্রত হোন নি। পরে আর ডাকিনি। বারান্দায় চলে যাই। কিন্তু, একটু আগে আপনি কেমন জানি কেঁদে উঠলেন। আমি বারান্দায় ছিলাম। মনে করেছি কিছু হয়েছে কিনা। কিন্তু, রুমে এসে দেখি আপনি ঘুমের মধ্যে এরকম কাঁদছিলেন। কবার ডাক দিয়ে কাজ না হলে শেষমেশ আপনার মাথায় স্পর্শ করে হাত বুলিয়ে ডাক দিলাম। আর জাগ্রত হলেন। কিছু মনে করবেন না। স্যরি।
.
মাহিম অপরাধীর মত একদমে একনাগাড়ে কথা গুলো বললো হিমির চোখের দিকে তাকিয়ে। কেমন জানি তার চোখের ভেতর কিছু একটা কাজ করছিল। হিমি দুবার চোখ নামিয়ে নেয়। পরে আবার তাকিয়ে দেখে তার দিকে তাকিয়ে কথা গুলো বললো।
তাড়াতাড়ি উঠে, ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় আসেন। দুজনে বসে চা'খাবো। কি এক কাপ চা খাওয়া যাবে আমার সাথে?
.
ভ্রু নাচিয়ে কথাটা বলে মাহিম বারান্দায় চলে যান। মাহিমকে যত দেখছে ততই হিমি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ কেমন মুগ্ধতা! পুরুষের প্রতি তার ঘৃণা ছাড়া কোন মুগ্ধতা কাজ করেনি। কিন্তু, এ কেমন অনুভূতির প্রকাশ ঘটছে ভেতরে।

হিমি বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের ভেতর চলে গেলো। এদিকে মাহিম একা একা মনে মনে কিছু একটা বলে মৃদু হাসছে। ফোনের দিকে তাকাতে দেখে অনেকটা সময় চলেগেছে। সে কি আসবেনা? আমার সাথে কি চা খাবেনা মৃদু বাতাসে সুন্দর সকালটাতে? মাহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলে উঠে, "হয়তো না।

একটুপর হিমি আকাশীরং কালারের শাড়ি পড়ে, চোখে গাঢ় কাজল, কানে দুল, নাকে নাকফুল দিয়ে হাতে সুন্দর দেখে চুড়ি পড়ে নিল। আয়নার দিকে তাকাতে চমকে উঠে! এটা কি আমি? কেমন সব অদ্ভুত রকম মনের মাঝে প্রশ্ন উঠে। এরকম তো কোনদিন নিজেকে আয়নায় উপলব্ধি করে নি হিমি।

হিমি আর একবার নিজেকে ভালো করে দেখলো। নাহ্, সব ঠিকঠাক আছে। গুটি গুটি পায়ে বারান্দায় দিকে চলে যায় হিমি। বারান্দায় গিয়ে দেখে বাহিরের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে মাহিম। হিমি পাশে গিয়ে দাড়িয়ে হালকা করে কাশি দেয়। মাহিম চমকে গিয়ে তাকাতে অবাক হয়ে যায়। এ কাকে দেখছে? মনে হচ্ছে কোনো পরী নেমে এসেছে আসমান থেকে! আকাশী রং এর শাড়ি পড়েছে, চোখে গাঢ় কাজল দিয়েছে, কানে সুন্দর দুল, নাকে নাকফুল দিয়ে হাতে কিছু সুন্দর চুড়ি পড়েছে। মাহিম মনে মনে বলে উঠে "আলহামদুলিল্লাহ!

মাহিম মনে মনে বলে উঠে, উনি পরী হতে পারেনা। কারণ, পরীরা তো চোখে কাজল পড়েনা।
---আমি কি বসতে পারি।

হিমির কথায় মাহিম বাস্তবে ফিরে আসে।
---কেনো না। বসুন বসুন।
.
মাহিম নড়েচড়ে বসে বললো কথাটা। হিমি বেতের চেয়ারে বসলো। হিমির সামনে মাহিম বসে আছে। মাঝখানে টেবিল। টেবিলের উপর তিনটা বই। দুটা হাদিসের। আর একটা বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলামের রাজবন্দী মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাস। তার পাশে চায়ের কাপ আর ফ্লাশ।
---আপনাকে চিনি ক'চামচ দেব।
.
কথাটা বলে মাহিম হিমির দিকে তাকালো। হিমি বলে উঠলো,
---দু চামচ দিন।
.
মাহিম দু'চামচ চিনি দিয়ে কাপটা হিমির দিকে বাড়িয়ে দিল। হিমি কাপটা হাতে নিয়ে মাহিমের দিকে তাকিয়ে আছে। মাহিম দেড় চমচ চিনি নিয়ে চুমুক দিতে দিতে বলে,
---কি ভাবছেন? আমি কিছু মিশিয়ে দেইনি তো। তাই না।
---উঁহু।

 মাথা নেড়ে বলে হিমি। মাহিম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো,
---কি হলো খান এক চুমুক। চা ঠান্ডা হয়ে গেলে মজা পাবেন না।
.
হিমি এক চুমুক দিতে মনটা জুড়িয়ে যায়। এমন চা এর আগে কখনও খেয়েছে কিনা আদৌ মনে পড়ছে না। কাপটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে মাহিমের দিকে তাকায়। মাহিম হঠাৎ চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন। লোকটার কিছু হয়নি তো? মনে মনে বলল হিমি। পরক্ষণেই চোখাচোখি হতেই হিমি চায়ে চুমুক দিয়ে টেবিলে রাখে। মাহিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে,
---চা'টা শেষ করে ডাইনিং রুমে চলেন। মা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
---হুমম।
.
মাথা নাড়ায় হিমি। মাহিম চা শেষ করে হিমির চা শেষ হবার অপেক্ষায় আছে। হিমি যতবার চা'তে চুমুক দিচ্ছে ততই মনপ্রাণ জড়িয়ে যাচ্ছে। যদি প্রতিদিন এরকম করে চা'করে দিতো। তাহলে চা খেতে আমি রাজি। অবশ্য চা খাওয়া হয়নি প্রায় কতবছর আগে তা মনে পড়ছে না।

মাহিম গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
বললেন না চা কেমন হয়েছে।
ও হ্যাঁ মনেই নেই। চা খেতে খেতে সব ভুলে গেছিলাম। এত সুন্দর করে চা আর কোনদিন খায়নি। বিশ্বাস করুন।
.
মাহিম মৃদু হাসলেন। হিমি মনে মনে বলে উঠলো, "একটুখানিক অট্টহাসি হাসলে কি হতো। নাকি তার আক্কেল দাত আছে? হয়তো আছে, না হলে অট্টহাসি হাসতো।

মাহিমের মা মাহমুদা বেগম মাহিম আর হিমি ডাইনিং রুমে বসে আছে। সাথে বসে দুএকটা মেহমান। তাকে কাল রাতে দেখি নি হিমি। হয়তো ভালো করে লক্ষ করেনি হিমি। তাই বোধহয় অদেখাকে অচেনা লাগছে।

একটুপর খাওয়াদাওয়া পর্ব শেষ করা হলো। মাহমুদা বেগম মাহিমকে কি যেন বলছে। মা ছেলের মাঝে কি যেন কথা হচ্ছে। হিমি স্থীর চোখে দেখছিল। মাহিমের চোখে চোখাচোখি হতে হিমি চোখ ফিরিয়ে নেয়।
বৌমা বোধহয় একা একা বোরিংনেস ফিল করছে তুই যা। কিছু সময় দে । মেয়েটার এখানে তুই ছাড়া কেউ নেই কথা বলার। এসব নিয়ে পরে কথা বলি।
ঠিক আছে মা।
আমি বিয়াইয়ের সাথে কথা বলছি। আর তোর মামা আসছেন। সেরকম কোন ঝামেলা হবে না আর।
মামা রাতেই বাসায় গেল কেনো বুঝলাম না মা। কোন সমস্যা হয়েছিল বাসাতে?
এসব কথা পরে বলি। আর সেরকম কিছুই হয়নি। আর যাতো মেয়েটা কখন থেকে একা একা বসে আছে।
.
মাহিম মায়ের কথায় হিমির কাছে চলে আসে। হিমির পাশে বসে পরে সোফায়। কিছু বলতে যাবে তখনি হিমি বলে উঠলো,
আপনার ফোনটা দিবেন।
.
মাহিম হিমির দিকে তাকিয়ে আছে। ফোনটা হিমির দিকে বাড়িয়ে দেয়। হিমি ফোনটা নিয়ে বলে,
ভয় পাবেন না। আমি আপনার পার্সোনাল কিছু দেখবনা।
আপনি যেটা ভাবছেন সেরকম কিছুই নেই আমার। আর থাকলে আপনার দেখার অধিকার আছে।
.
মাহিমের দিকে ভালো করে তাকিয়ে ফোনটা নিয়ে রুমে চলে যায় হিমি। মাহিম কিছুই বুঝতে পারেনি। কিছু মনে করলো না তো হিমি? কিছু তো মনে করার কথা না। সেরকম কিছুই তো বলেনি।
.
.
দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। হিমি আর মাহিম গাড়িতে বসে আছে। হিমিকে বেশ খুশি দেখাচ্ছে। বিয়ের পরে একটা দিন একটা মেয়ের কতটা বছর মনে হয় সেটা মেয়েরা ছাড়া ভালো কেউ বুঝতে পারবেনা। কতবছর এক সাথে থেকে, বিয়ে নামক শব্দ আবদ্ধ হয়ে বাবা-মাকে সহ পরিবারের সবাইকে ছেড়ে পাড়ি দিতে হয় শ্বশুর বাড়ি। এক এক করে নিজের সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে হয় বাবা-মা এবং পরিবারের সকলের মায়া-মমতার, ভালোবাসা ত্যাগ করে শ্বশুরবাড়ি। বাঁচতে শিখতে হয় নতুন ভাবে, নতুন রুপে। নতুন করে পথ চলা। নতুন করে বাস্তবতার পথ ধরে এক এক হেঁটে চলা।

 নিয়তিকে মেনে নিয়ে হাজারো দুঃখ, কষ্ট, সুখ, মান-অভিমান, স্নেহ, ভালোবাসা, আস্থা, ভরসার কাঁধ খুঁজে একটা জীবন সঙ্গী সাথে নামিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার নাম হলো সংসার।

No comments:

Post a Comment