জীবন সঙ্গী (প্রথম পর্ব) - Mahbub Ullah

Breaking

Monday, December 16, 2019

জীবন সঙ্গী (প্রথম পর্ব)

জীবন সঙ্গী (প্রথম পর্ব)
লেখক- নাসির ইসলাম মাহিম।

আজ মিহির দ্বিতীয় বিয়ে হলো। বিয়েটা সম্পূর্ণ পারিবারিক ভাবে হয়েছে। সাধারণভাবে বলা যায়। মেহমান নেই বললে চলে। ছেলের বাসায় যেকয়টা মেম্বার সেই কয়টা মেহমান। তাছাড়া বাহিরের আত্মীয় স্বজনরা আসেনি। কেনো আসেনি, তা এখনও বলেনি তারা। বাবা জিজ্ঞেস করেছিল। 

 এখন হিমি বসে আছে বাসর ঘরে। নানা রকম চিন্তা মাথায় এসে ভর করছে। এই দ্বিতীয় বিয়ের কতদিন সংসার চলবে? সব চিন্তাভাবনা এসে হিমিকে গ্রাস করেছে। কতবার বাবাকে বলেছে। আমি আর বিয়ে করতে চাই না।
আমি যেরকম আছি সেরকমই ভালো আছি। আমি একাই ভালো আছি। সংসার নামক জিনিসটা আবদ্ধ হতে চায় না।
 কিন্তু, বাবা শোনেনি। একটা মেয়ে বাবার ঘরে এসে থাকলে কতটা বোঝা হয়ে যায় তা সেই জানে। তাই বাবার জোরাজুরিতে বিয়ের পীড়িতে বসতে হয়েছে। 

হিমি ঘড়ির দিকে তাকায়। তার স্বামী এখনও রুমে আসে নি। বাসর ঘরে নববধূ একা একা অপেক্ষার প্রহর গুনছে। হিমি ভাবনায় ডুবে যায়। সেদিন ছিল হিমির খুব হাসি-খুশির দিন। বাসাতে যখন আহিনের সঙ্গে বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে যায়। কতনা স্বপ্ন ছিল তাকে ঘিরে। বাবা তো অন্য কারও সাথে বিয়ে ঠিক করে। বিয়ের প্রায় পাকা কথা দিবে তখনি হিমি বলে, 
বাবা! আমি এই বিয়ে করতে পারবোনা। 

হিমির বাবা আফজাল হোসেন কথাটা শুনে শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে যাবার উপক্রম। নিজেকে কন্ট্রোল করে শান্ত গলায় বলল, 
মা! আমি তো সব পাকাপোক্ত করে রেখে দিছি। এখন শুধু বিয়ে দিনটা বাকি। 
.
বাবার কথাটা শুনে হিমি রেগেমেগে কটমট করে উঠে। গাজ্বালা দিয়ে উঠে হিমির। হিমি বড় গলায় বলল, 
কি! আমাকে না বলেই সব ঠিকঠাক করেছ। বাবা! আমার একটা কথাটা স্পষ্ট শুনে রাখো,  আমি আহিনের ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবো না।
.
আফজাল হোসেন বাকরূদ্ধ হয়ে যাবার উপক্রম। মেয়ে যে এমন কথা বললে সেটা কল্পনায় ভাবতে পারেনি। তিনি চশমাটা খুলে চোখ মুছতে মুছতে বাসা থেকে বের হোন। এদিকে আফজাল হোসেনের স্ত্রী শুধু আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ফেলে। বাবা মেয়ের মাঝে কোন শব্দ করে নি। ধমকও দেননি একটাবারও। ধমক দিয়ে কোন কাজ হবেনা। তার মেয়ের রাগ ভালো করে জানে। 

 প্রায় দেড়ঘন্টা পর বাসায় আসে আফজাল হোসেন। স্ত্রীকে বলে হিমি কোথায়, 
ওর রুমে দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে। 
খেয়েছে? 
না। কত ডাকলাম উঠেনি, খায়নি। 
.
আফজাল হোসেন রুম থেকে বের হতে আফজাল হোসেনের স্ত্রী রাহেলা বেগম বলে উঠলো,
মেয়েটাকে কিছু বলোনা আর। রাতে খায়নি। 
.
আফজাল হোসেন স্ত্রীর কথায় উত্তর না দিয়ে হিমির রুমের দরজার কাছে গেল। কিছু একটা ভেবে দরজায় কড়া নাড়াই। কোন শব্দ না পেয়ে ভয় পেয়ে যায় আফজাল হোসেন। প্রচন্ড ভয় পেয়ে তার স্ত্রী রাহেলা বেগমকে চাবি আনতে বলে। চাবি এনে দরজা খুলে দেখে দেখে বিছানা ছুঁড়ে ফেলে রেখে বিছানার উপর শুয়ে পড়েছে।

আফজাল হোসেন হিমির পাশে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ডাক দেয়। হিমি জেগে যায়। চোখ মেলে দেখে বাবা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কপট রাগ দেখিয়ে হাত সড়িয়ে দেয়। আফজাল হোসেন মুখে হাসি মিলিয়ে ধরে বলে, 
চল মা খেতে চল। রাতে বলে খাস নি। চল মা বাপ বেটি এক সাথে খাবো। চল,,
না, আমি খাবো না। 
চল না মা। আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে খুব। চল খাবো,,, 
বলছি তো খাবো না। ডিস্টার্ব করো না তো বাবা। আমার ক্ষুধা নেই। 
.
রাগ করে বলে হিমি। আফজাল হোসেন তবুও মুখে হাসির রেখা মিলিয়ে ধরে বলে, 
আহিনের সাথে তোর বিয়ে হবে। আমি পাকাপোক্ত করে এলাম। ওদের না করে দিয়ে। আহিনের বাবার সাথে কথা বলে এলাম,,,
.
কথাটা বলে আফজাল হোসেন রুম থেকে বের হয়ে যান। হিমি হা করে তাকিয়ে আছে। সে কি স্বপ্ন দেখছে নাকি সত্যি। রাহেলা বেগম হিমির মাথায় হাত বুলাতে বুঝতে পারে। না এটা স্বপ্ন না। এটা সত্যি। তাহলে কি বাবা সত্যি বলছে? মাকে জড়িয়ে ধরে। 
চল মা খাবি। তোর বাবাও খায়নি,,, 
.
রাহেলা বেগম হিমিকে নিয়ে খেতে যায়। হিমি তো মহাখুশি। পছন্দের মানুষকে বিয়ে করবে। কত না স্বপ্ন ছিল তাকে ঘিরে। আজ সেটা পূরণ হতে চলেছে। 

 সেদিন বিয়ে ঠিকই হয়েছিল। মাস কয়েক চলে গেল। সমস্যা হলো ৬ মাস পর। আহিন নাকি তার অফিসের কলিগের সাথে প্রেম ভালোবাসার ডুবে গেছে। সামান্য কথা কাটাকাটি নিয়ে ঝগড়া বাধলে মারধর করে। সমস্যা ক্রমে বাড়তে থাকে। শেষে হিমি সহ্য করতে না পেরে বাবার কাছে যেতে চাইলে সেটা নিয়ে প্রচন্ড ঝগড়াঝাটি হয়।

 সেদিন ঠিকঠাক দিন রাত কেটে যায়। এভাবে দুদিন দুরাত কেটে যায়। তৃতীয় দিনে আহিন ডিভোর্স লেটার হিমির হাতে তুলে দেয়। হিমির মাথায় বজ্রের মত আকাশ ভেঙে মাথার উপর পড়ে। চিৎকার দিয়ে তাকাঁতেও পারছেনা। ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে।
ভেতরটা জ্বলে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে। এই আহিনকে ভালোবেসেছিল। এই আহিনকে ভালোবেসে, বাবার মতে বিয়ে করতে চাই নি। শত শত প্রশ্ন এসে ভিড় জমিয়েছে মাথায়। 

 আহিন আগে থেকে সাক্ষর করে রেখে দিয়েছে। তাই আর হিমি কোন কথা না বলে সাক্ষর করে আহিনকে মুক্তি দিয়ে দেয়। সামান্য কথা কাটাকাটি নিয়ে ঝগড়া বাধলে মারধর করে,  ঝগড়াঝাটি বাধিয়ে দেয়। যাকে পছন্দ হয়না তার ভালো কাজটাও খারাপ, অপছন্দ হয়ে যায়। যে তার সাথে থাকতে চায় না। সেখানে জোর করে থাকা অসম্ভব, বোকামি। সেই বোকামি আর করতে চায় না হিমি। 

হিমি নির্লজ্জের মত বাবার কাছে ছুঁটে আসে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবার চোখে অঝোর ধারায় ঝর্ণার মত পানি ঝড়ে পাঞ্জাবি ভিজে যাচ্ছে। আফজাল হোসেন স্থির থাকতে না পেরে মেয়েকে বুকে টেনে জড়িয়ে কেঁদে ফেলে। হিমিও বাবাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে দেয়। হিমির মা বাকরূদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে। সে কি স্বপ্ন দেখছে, নাকি বাস্তব? হয়তো বাস্তব। হিমি মায়ের কাছে সব কথা বলেছিল। তাহলে কি হিমি আহিনকে ছেড়ে এসেছে? হয়তো এসেছে চিরদিনের জন্য। 
.
দরজার শব্দ শুনে হিমি ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে। ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল এতক্ষণ। চোখের পানি মুঁছে ফেলে। হাতের গহনা সহ সমস্ত গহনা শব্দের অর্থ বুঝে ফেলবে যেকেউ, মেয়েটা কাঁদছে।  কারও উপস্থিতি টের পেয়ে চোখের পানি মুঁছে ফেললো। 

উনি দরজা লাগাতে লাগাতে অপরাধীর মত বললেন,
আসলে আমি দুঃখিত। আপনাকে একা একা এখানে বসে রাখাটা ঠিক হয়নি। আসলে মামণিকে ঘুমি পাড়িয়ে দিয়ে আসতে আসতে অনেক দেড়ি হয়ে গেছে। আর রাত অনেক হয়েছে। এখন তো আপনার বাসায় ফোন দেওয়া ঠিক হবেনা। সকালে ফোন করে কথা বলবেন। তবুও কাঁদবেন না। আর যদি সেটাও কষ্টকর হয় তাহলে ফোন দিয়ে কথা বলেন। প্লিজ কাঁদবেন না। এই মধুময় রাতে মেয়েদের কাঁদতে নেই। 
.
একদমে কথাগুলো বলে ফেললো উনি। আমি কিছু বললাম না। মাথা নাড়ালাম। উনি বোধহয় একটু খুশি হয়েছেন। 

উনি এসে বিছানায় বসতে আমি বলে উঠলাম, 
---আমি মানুষিক ভাবে প্রস্তুত না,,,
.
হিমির কথাটা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় উনি। উনি হয়তো এই কথাটা আমার থেকে এক্সপেক্ট করেনি।  

হিমির কথাটা শুনে, কথা বলতে গিয়ে আটকে যায়। মুখে হাসি নিয়ে বলে,
---আসলে আপনি যেটা ভাবছেন,,, 

উনাকে থামিয়ে দিয়ে হিমি জোর গলায় বললো,
---আপনাদের মত পুরুষদের আমি ভালো করে চিনি। 
---আপনি কতজন পুরুষকে চেনেন?
.
উনার কথা শুনে হিমি কিছুটা আশ্চর্য হয়ে যায়। হিমির কোন উত্তর না পেয়ে উনি বললো,
---আপনার বুঝি পুরুষ জাতিদের প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা তাইনা। আচ্ছা ওসব কথা বাদ দিন। আপনার নামটা কি জানতে পারি।
.
ওনার কথা শুনে বেশ ভালোই লাগছে। কথা বলার ধরন দেখে আড় চোখে দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু লম্বা করে ঘোমটা দেওয়াতে দেখা যাচ্ছে না। ওনাকে একবারও দেখে নি। না দেখে বিয়েতে মত দিয়ে দেই বাবার কথাতে। 
মামণির কাছে একবার আপনার নামটা শুনেছি "হিমি। আচ্ছা সমস্যা নেই। নাম না বলতে চাইলে জোর করে জানতে চেষ্টা করবো না।

ওনার কথায় নিজেকে কেমন জানি অপরাধী মনে হচ্ছে। তাই বললাম, 
---হুমায়রা রহমান হিমি। 
---বাহ্ বেশ।সুন্দর নাম তো।
---ধন্যবাদ। 
.
উনি নিশ্চুপ হয়ে বসে কিছু ভাবছিলেন, তখন আমি বললাম,
---আপনার নামটা বললেন না যে!
.
উনি বোধহয় একটু হাসলো। তারপর বললো,
---মাহমুদ আহম্মদ মাহিম,,,
.
বেশ ভালোই নামটা। সুন্দর বটে। নামটার সাথে কন্ঠটা বেশ সুন্দর। যেকেউ নেশাগ্রস্ত হয়ে যাবে তার কন্ঠে। 
কিছুক্ষণ চুপ থেকে উনি বললো,
আমি আপনাকে সেরকম সম্পর্ক গড়ে তুলতে বলছিনা। যেটা স্বামী স্ত্রী অধিকার। আমি চাই আপনি আগে আমাকে পরিপূর্ণ ভাবে চেনেন, জানেন তারপর না হয় ভেবে দেখবেন। কেমন। এখন আপনি এখানে শুয়ে পড়ুন। আমি সোফাতে গিয়ে ঘুমায়। আর চিন্তা করবেন না। আমি সোফাতে ঘুমাতে পারি।

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। উনি আবার বললেন, 
আর হ্যাঁ বাসর রাতে দু’রাকাআত নফল নামাজ পড়তে হয়। আমি পড়ে নিচ্ছি। আপনি পড়ে নিয়েন। 

উনি চলে যেতে থেমে গিয়ে পিছন ফিরে হাত দিয়ে ইশারা করে বললো, 
ওই দিকে বাথরুম ও ওয়াশরুম আছে। আপনি খুব টায়ার্ড। সারাদিন অনেক ধক্কল গেছে আপনার উপর। ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ুন।

কথাটা বলে মাহিম ওয়াশরুমে চলে গেলেন। হিমি কিছু একটা ভাবতে ভাবতে সামনের দিকে তাকাতে দেখে ফ্রেশ হয়ে বের হয়। জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ে। 

 শুয়ে পড়ছেন। লোকটার মাঝে আহিনের কোন মিল নেই। তার মাঝে আর আহিনের মাঝে রাত দিন তফাত। 

হিমি বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে নামাজ আদায় করে বিছানায় আসতে দেখে মাহিম ঘুমিয়ে গেছে। কি মায়াবী চেহারা। তার দিকে তাকিয়ে থাকলে কিছু একটা কাজ করে হিমির। হয়তো মায়াটা কাজ করছে। 

 হিমি মনে মনে বলে, কি পাতলা ঘুম। অল্প কিছুক্ষণের ভেতর গভীর ঘুমে আছন্ন। হিমি বিছানা থেকে চাদরটা নিয়ে মাহিমেন শরীরের উপর দিয়ে দেয়। মাহিম চাদরটি পেয়ে নড়েচড়ে ভালো করে শুয়ে পড়ে।

হিমি বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। এপাশ থেকে ডান পাশে হয়ে শুয়ে চাদরটা টেনে গায়ে মেখে নেয়। সারাদিন অনেক ধক্কল গেছে। শরীরটা খুব টায়ার্ড লাগছে। কিছুক্ষণের ভেতর গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় হিমি। 

No comments:

Post a Comment