পুলিশীনি (ষষ্ঠ পর্ব) - Mahbub Ullah

Breaking

Friday, July 26, 2019

পুলিশীনি (ষষ্ঠ পর্ব)

পুলিশীনি (ষষ্ঠ পর্ব)

লেখা- নাসির ইসলাম মাহিম
.
.
ক্লাস শেষ। রিকশায় চড়লে পুরো আকাশটাকে মাথার ওপর পাওয়া যায়। পুরো আকাশটা মনে হয় আমার মাথার উপর থায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই রিকশা আমার এত পছন্দের। শেষ বিকেলের ঠান্ডা বাতাস আমাদের ছুঁয়ে পেছনে থেকে যায়। আবারও হালকা বাতাস এসে ঠান্ডা ছুঁয়ে যায় শরীর। মাঝে মাঝে কেঁপে উঠে শরীর। ভালোই শীত পড়ছে। সময়ের আগে শীত পড়াটা এখনকার একটা ফ্যাশন হয়ে গেছে। পৌষ মাস আসতে এখনো দেরি আছে। অথচ এখনই কি শীত। কনকনে শীত পড়েছে আজকাল। আর আমি বোকার মত চে গুয়েভারার মাথাওয়ালা একটা টিশার্ট পরেই ভার্সিটি চলে এসেছি। মনে মনে নিজেকে গালি দিতে ইচ্ছা করছে। 'নে জড়ায়া নে।' চৈত্রী ওর বিশাল চাদরটার একদিক বাড়িয়ে দিল।
লাগবেনা। শীত করতেছে না।'
বোকামীটা স্বীকার করব নাকি? না থাক স্বীকার করবো না।
হইছে আর ঢং দেখাইস না। নেতো।

ভাতের উপর রাগ করে লাভ নাই। তাই চাদরের একদিক গায়ে জড়ালাম। আর চৈত্রী বকবক করে যেতে লাগল। আমি ভালো শ্রোতা। আর অভ্যাসও হয়ে গিয়েছিল।
রিক্সাওয়ালা প্যাডেলে পা চালাচ্ছিল দ্রুত। হয়ত আজ আর 'খ্যাপ' মারবে না। আমরাই লাস্ট পেসেঞ্জার। ঘরে ফেরার তাড়া আছে হয়ত বেচারার। হয়ত নতুন বিয়ে করেছে। নতুন অবস্থায় কেমন জানি বাড়ির বাহিরে থাকাটা বোকামি মনে হয়। এই সময়ে কতনা গল্প, হাসি, ঠাট্টা ইত্যাদি করা যায়। ঘরে নতুন বউ। 'আহা। ব্যাটা আস্তে চালাস না। তোর বউকি ভাইগা যাইতেসে? মনে মনে রিকশাওয়ালাকে ধমক দিলাম। ধমকে কাজ হয়েছে বলে মনে হল না। তার নবীজির গতিবেগে গাড়ি চালাচ্ছিল।

রিক্সা দ্রুতলয়ে চলছিল। চৈত্রী বকবকবক করছিল। আর আমি ভাবছিলাম। ভাবছিলাম- "কত ছোট এই জীবন। তারচেয়ে কত ছোট এই রিকশা-ভ্রমন। দেখতে দেখতেই শাহবাগ চলে আসবে; বা এই রিকশা শাহবাগে পৌছে যাবে। রিকশাটা যদি অনন্তকাল ধরে এমনি চলতে থাকত। কতনা সুন্দর হতো। আমরা একটা চাদর জড়িয়ে বসে থাকতাম। নিজেকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানালাম চাদর না আনার জন্য। সাথে চে গুয়েভারাকেও।

আজকাল মশা এত বাড়া বেড়েছে। 'শালার মশা'। আস্তে করে আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম।
মেয়েটা পাশ থেকে উঠে গেল। বিছানায় গিয়ে বসল। ওর চোখে বিষন্নতার হালকা নীল রঙ।
তুই আমাকে ভালবাসতি, তানভী?
বুঝতিনা?
এখনো বাসিস?
কি মনে হয়?
বলিসনি কেন আমাকে?
আবার দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। পাথরের নীচে চাপা থাকা শ্যাওলা মাখা স্যাতস্যাতে দীর্ঘশ্বাস।
আমি জানি কেন বলিনি। নিজের ভীরুতাকে পায়ে পিষে, আয়নার সামনে বারবার রিহার্সেল শেষে চৈত্রিকে বলতে গিয়েছিলাম। বলতে গিয়েছিলাম ভালবাসি। উন্মাদপ্রায় অবস্থা ছিল- 'হয় বলব নাহয় মরব।' বলতে পারিনি। মরেছিলাম। কেউ জানলও না আমি মারা গেছি। হ্যা মারা গেছি! যেরকম একটা অমৃত মানুষ মারা যায়, সেরকম আমিও মারা গিয়েছিলাম। আমার জানাজা হল না। আমাকে পোড়নো হল না। একফোঁটা চোখের জলও কারও চিবুক বেয়ে গড়ালো না। শুধু আমি জেনেছিলাম- মারা গেছি। প্রত্যহ মারা যেতাম আমি। কেউ বুঝতে পারে নি। একটুও না। শুনেছিলাম, মানুষ মারা গেলে আস্তে আস্তে সবাই ভুলে যায়। কিন্তু, আমার বেলায় তা ভিন্ন ছিল। আমি পারিনি তাকে ভুলতে। পারি নি নিজের করে নিতে!

সেদিন হাতে সময় নিয়েই ভার্সিটিতে গিয়েছিলাম। ওকে কোথাও দেখলাম না। তপ্ত চোখজোড়া চৈত্রীকে খুঁজছিল। হঠাৎ চোখ খুঁজে পেল মুখটাকে; টিএসসির কোনে। ইমতি আর চৈত্রী বসে আছে। চৈত্রীর হাত ধরে আছে নায়ক ইমতি। যে নাটকে এতক্ষন আমি নায়ক ছিলাম সেই নাটকের দর্শকরা চমকে গিয়ে আবিষ্কার করলেন যে- আমি নায়ক না, আমি ভিলেন। আসলে ভিলেনও না। আমি কিছুই না। I Am Nobody (আই এম নোবডি)। ফিরে এসেছিলাম এতদিনের অভিনয়ের পারিশ্রমিক- চোখঝাপসা করা লবনাক্ততা আর ফুসফুসভর্তি কষ্ট নিয়ে। চলে এসে নিজেকে পাহাড়ি ঝর্ণা বানিয়ে ছিলাম। অনেক চেষ্টা করেছিলাম। নিজেকে বৈশাখের কালো ঝড় না বয়তে। কিন্তু নিষ্ঠুর চোখ মানে নি। শোনে নি কারও কথা। যেরকম আকাশের কালো মেঘ জমে থাকা হঠাৎ করে বর্ষণমুখর হয়। সেরকম আমারও হয়েছিল। সেদিন থেকে নিজেকে পাথর বানাতে শিখিয়েছি। শিখেছি রোবটের মত জীবনযাপন করার। তারা তো কখনও প্রেম, ভালোবাসা, সংসার করে না। তারা অন্যের জন্য কাজ করে যায় সারাক্ষণ।

এবারের দীর্ঘশ্বাসটা আদতেই বেশ দীর্ঘ হয়। চৈত্রী পেছনে বসে থাকে চুপচাপ। পেছনে বসা বলে ওর মুখ দেখতে পাই না।

এখনও তোকে দেখি। ভার্সিটিতে গিয়ে তোকে দেখি না আসলে- তোকে দেখার জন্যই ভার্সিটি যাই। এমন ভাব করি যেন কিছুই হয় নি। আমি ঠিক আছি! আমার কিছুই হয়নি এমন। কিন্তু, যদি কেউ এই হৃদয় ভাংগা কেউ দেখতো তাহলে সে বুঝতো, ভালোবাসার জন্য ভেতরে জ্বলে,পড়ে ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, উপরে দেখতি সব ঠিকঠাক চলছে। তুই হয়তো বুঝিস কিছু। হয়তো না। নতুন নায়ক নিয়ে তোর সুখ দেখে আমি পুড়ি। হিংসার আগুনে, অভিমানের আগুনে, অসহায়ত্বের আগুনে। জানি আমি স্বার্থপর; সবসময় নিজের দিকটাই দেখি আমি। কারন আমি তানভী, হ্যা তানভী বাদে একটা নাম আমার ভেতর বসবাস করে "কবি! আমি মহাত্না গান্ধী বা গৌতম বুদ্ধ নই। তোকে এড়িয়ে চলি। নিদেনপক্ষে তোর কাছ ঘেঁষি না। ভুলেও তোর চোখের দিকে তাকাই না। মাঝে মাঝে তোর সামনে পড়ে যাই। তখন তুই বলিস, "'কিরে ইদানীং এত পার্ট নিতেসিস ক্যান?' সত্যি করে বলছি আমি পার্ট নেই না। আমার কষ্টগুলো তোর কাছ থেকে লুকানোর জন্যই এই পালিয়ে বেড়ানো। আমি শুধু দূর থেকে তোকে একটু দেখি। একদিনে থিতিয়ে ওঠা কষ্টের আগুনটাতে ফুঁ দেই। কষ্ট তার ফেনিয়ে ওঠা শিখা নিয়ে আমাকে গিলে খায়। তোকে হারিয়ে এখন এই কষ্টটাই সম্বল। অন্তত এই কষ্টটা হারাতে চাই না।

নেটে অনলাইন থাকি। তোকে দেখি। আমি নক করিনা। তুইও না। অপেক্ষা করি শুধু। হয়ত তোর নকের অপেক্ষায়। যদি ভূল করে কখনও আমাকে নক করিস। কিন্তু, পরক্ষণে ভাবি, হয়তো তুই ইমতির সাথে চ্যাটে ব্যস্ত। হয়ত আমাকে দেখিসই নি। হয়তোবা দেখিস। কখনো-সখনো নক করিস। হাই-হ্যালো হয়। তারপর আবার নীরবতা। আমি আবার এক টেবিল-চামচ কষ্ট গিলে ফেলি।

পেছনে ফিরি। চৈত্রী নেই। এই মেয়েটা হঠাৎ আসে- হঠাৎ যায়।আবার পুরোনো কুয়ায় জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।
নিজের সাথে অভিনয়ের খেলা করি। নিজেকে বোঝাই- চৈত্রীকে ভোলা কোন ব্যাপারই না। আর আমি কি বেহায়া নাকি? তবুও মাঝে মাঝে খুব আলতোভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কানে যেন দীর্ঘশ্বাসের শব্দটা না পৌছায়। অন্তত কানটা জানুক আমি ভালো আছি।
ইদানীং রাত জাগাটা বেশি হচ্ছে। এত রাত জেগে থাকা ভাল কিছু না। এটাকে কনট্রোল করতে হবে। চৈত্রীর ব্যাপারটাও কন্ট্রোল করতে হবে। এমন না ওকে ছাড়া থাকা যাবে না, ওকে না দেখলে মন অশান্ত হয়ে থাকবে। ওর চেয়ে অনেক সুন্দর মেয়ে আমার সাথেই পড়ে তিন-চারজন। আমিও দেখি শায়েরীর সাথে চান্স নিতে পারি কিনা। অথবা বিথীকার সাথে।

চৈত্রীর গলা শুনতে খুব ইচ্ছা করছে। মোবাইলটা হাতে নিলাম।
'দুঃখিত। আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি- - - - - - - - '
চৈত্রীতো কখনো সেল অফ রাখেনা। ওর কি শরীর খারাপ? ওর কি অসুখ? ওর কি মন খারাপ? ও কি কাঁদছে এলোচুলে?
নাহ। কালকে খোঁজ নিতে হবে; আড়াল থেকে; আড়াল রেখে। তারপরে আর পাই নি।
.
কথাগুলি বলে তানভী চোখ মুঁছে অন্যদিকে তাকায়। নিয়নলাইটের আলোতে, নিতুর চোখে চিকচিক করছে অশ্রু।

কিছুক্ষণ নিরবতা থেকে নিতু বলে উঠে,
আই এম স্যরি।
.
তানভী অবাক হয়ে বলে,
আপনি কেনো স্যরি বলছেন!
আপনার অতীতকে সামনে তুলে আনার জন্য। আসলে আমি বুঝতে পারি নি এমন কোন ঘটনা জড়িয়ে আছে আপনার জীবনে। আই এম রেয়েলি সো স্যরি।
.
তানভী একটু হেসে বলে,
আরে না ঠিক আছে।
আচ্ছা আপনার বাসার কাছে চলে এসেছি। আর একটু পরেই।
ও হ্যা।
.
তানভী নিশ্চুপ হয়ে রাতের নিয়নলাইট আলো উপভোগ করছে। নিতু চিন্তিত হয়ে কিছু একটা ভাবছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে তানভী।

একটু পর উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টর ১৩২ নাম্বার বাসার কাছে রিকশা থেমে যায়। তানভী একটু খানি নিরব হয়ে নিতুর দিকে তাকায়। কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু, কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা।
কি হলো নামবেন না!
.
তানভী লজ্জা পেয়ে নড়েচড়ে বিব্রত হয়ে বলে,
ও হ্যা।
.
তানভী রিকশা থেকে নেমে রিকশা ভাড়া দিতে গেলে নিতু দিতে নিষেধ করে।
এই আপনি কি করছেন!
.
তানভী অবাক চোখে বলে,
কেনো রিকশা ভাড়া দেই।
.
নিতু মৃধু হেসে বলে,
দিতে হবেনা।
দিতে হবেনা মানে? ঠিক বুঝলাম না!
আরে আমি দিয়ে দেব।
আপনি দেবেন কেনো?
.
নিতু কপালের একগুচ্ছ চুল সরিয়ে বলে,
না মানে। আমি দিয়ে দেব।
যতটুকু সাহায্য করেছেন ততটুকু সারাজীবন মনে থাকবে।
সমস্যা নেই। অন্য একদিন আপনি দিয়ে দিবেন।
.
কথাটা বলে নিতু কঠিন চোখে তাকায় তানভীরের দিকে। তানভী কিছুটা অবুঝের মত বলে ফেলে,
অন্য একদিন মানে?
.
নিতু কিছুটা বিব্রত হয়ে বলে,
কিছুনা।

তানভী একটু দুরে গিয়ে দাঁড়ায়। নিতু সেই কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে অপলোক দৃষ্টিতে! তানভী বিব্রত করছে কথা বলতে।
আপনি দাঁড়িয়ে আছেন যে। বাসার ভেতরে যান!
আপনি কি একা একা যেতে পারবেন।
.
কিছুক্ষণ তানভীর দিকে তাকিয়ে মৃধু হেসে বলে,
ইনশা আল্লাহ! যেতে পারবো। বেশি দূর না। এই তো একটা গলির পরেই আমাদের বাসা।
.
তানভী কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যায়। তারপর নিতুর দিকে তাকিয়ে থাকে। নিতু আবারও মৃধু হেসে বলে,
এবার তাহলে আসি। আল্লাহ হাফেজ।
.
তানভী মাথা নাড়িয়ে সম্বদন করে। নিতু রিকশাওয়ালাকে বলে,
মামা চলেন।
.
রিকশা সামনের দিকে একটু একটু করে এগুচ্ছে। নিতু একবার রিকশা থেমে মাথা বের করে তাকায়। তানভী হাত তুলে বিদায় সম্বদন করে। একটু পর রিকশা পাশের গলিতে ঢুকে পরে। আর রিকশা দেখা যায় না।

তানভী বাসার ভেতর ঢুকে পড়ে। রাত গভীর হওয়াতে বাসায় নেই নি তানভী। এতো রাতে একটা মেয়েকে বাসায় নিয়ে গেলে যে কেউ প্রশ্ন করতে! কে মেয়েটা? এতো রাতে তোর সাথে কি করে? তাও আবার রাত প্রায় তিনটার কাছাকাছি। তুই কি এই মেয়ের সাথে ছিলি ইত্যাদি ইত্যাদি।

তানভী চাবি দিয়ে দরজা খুলে অবাক হয়। দেখে সবিতা বসে আছে ঝিম ধরে।
আম্মু তুমি এখনও ঘুমাও নি!
.
সবিতা তানভীর কথা শুনে ঘড়ির দিকে তাকায়।
ভালো লাগছিলনা বাবা। তাই বসে ছিলাম। যা ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়,
তুমিও ঘুমাও।
গুড নাইট।
গুড নাইট।
.
তানভী রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়। মনের ভেতর সেই কথাটা খটকা লাগছে তানভীর! কিছুক্ষণ এলোমেলো চিন্তা করে ঘুমিয়ে যায় তানভী।

No comments:

Post a Comment